জিন্দা পাথর বলতে গল্পের সেই অলৌকিক বা বুজরুকি পাথরের কথা বলছি না। বলছি এমন এক সাগরের জীবন্ত রহস্যময় পাথরের কথা যা একটি প্রাণী, যেটি তার চারপাশে তৈরি করে পাথরের কঙ্কাল। আমাদের প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন আর কক্সবাজারের ইনানী সৈকতে আমরা যে বড় বড় পাথরগুলো দেখি সাগর তীরে পড়ে থাকতে, তাই হচ্ছে আমাদের আজকের জিন্দাপাথর বা প্রবাল পাথর। এরা আসলে নিডারিয়া পর্বের সাগরে বাসকারী অ্যান্থজোয়া(anthozoa) শ্রেণীর প্রাণী। প্রবাল মূলত ছোট ছোট অমেরুদণ্ডী জীব। এদের পলিপ বলা হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল কয়েক সেন্টিমিটার বড় হতেই এদের লেগে যায় শত-শত বছর। এই পলিপ তাদের ত্বকের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে খোলস বা বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে। সাধারণত এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। কলোনির সমস্ত পলিপ জিনগতভাবে (জেনেটিক্যালি) একই রকম হয়। যদিও এরা প্রাণী, তবে এরা জীবনের পূর্ণবয়ষ্ক অবস্থায় সাগরতলে কোন শক্ত তলের উপর আসন গেড়ে বসে, বাকি জীবন পার করে দেয় কোন নড়াচড়া না করেই। একটা প্রবাল পলিপের মৃত্যুর পরেও খোলসটি রয়ে যায়। এরকম প্রবালের দেহাবশেষের উপর নতুন করে আবার প্রবাল জন্মাতে পারে। এভাবে একটা কলোনি বহু প্রজন্ম ধরে চলার ফলে বড়সড় পাথুরে আকৃতি ধারন করে। এভাবেই তৈরি হয় বড় প্রবাল দ্বীপ এবং প্রবাল প্রাচীর। প্রবাল আণুবীক্ষণিক জুয়োপ্লাংক্টন থেকে শুরু করে ছোট মাছ সবই খায়। এদের মুখে অনেকগুলো কর্ষিকা থাকে। এই কর্ষিকা ব্যবহার করে ক্ষুদ্রাকার সামুদ্রিক প্রাণি বিশেষ করে ছোটো ছোটো মাছ ও প্লাঙ্কটন কে আক্রমন করে এবং বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করে। এদের খাবার গ্রহন করার পদ্ধতি অনেকটা হাইড্রার মত(হাইড্রা নিয়ে অন্য একদিন গল্প হবে)। তবে অনেক প্রবালের দেহকলার ভিতরে zooxanthellae নামক এক ধরনের শৈবাল বাস করে। এই শৈবালগুলো সালোকসংশ্লেন পদ্ধতিতে খাবার উৎপন্ন করে। এই খাদ্য প্রবাল আহরণ করে এবং বিনিময়ে শৈবালগুলো প্রবালের নিঃসরিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড(CO2) এবং অ্যামোনিয়াম (NH4+) গ্রহণ করে। কিছু কিছু প্রবাল দেখলে মনে হবে এরা মনে হয় আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। আসলে এদের মধ্যে কিছু রঞ্জক উপাদান সূর্যের আলোকে আটকে দেয় এবং সেই আলোকে আবার প্রতিফলিত করে। এই প্রতিফলনের ফলেই সেই প্রবালগুলো জ্বলে থাকতে দেখা যায়। এরা আসলে এভাবে তাদের ভিতরে বাস করা শৈবালদের সূর্যের আলোর ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করে। অগভীর অঞ্চলের এসব প্রবাল গোলাপি বা বেগুনী বর্ণ নির্গত করে থাকে। গভীর সমুদ্রেও কিছু প্রবালের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু এতো গভীরে তো সূর্যের ক্ষতিকর আলোকরশ্মি যায় না। বিজ্ঞানীরা এই প্রবালগুলোকে গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন কাহিনী আরো চমকপ্রদ। এরা তাদের দেহে যেসব শৈবাল বাস করে তাদের খাবার তৈরির জন্য সালোকসংশ্লেষণের সময় যে আলো লাগবে সেই আলোর যোগান দেয়। এক্ষেত্রে তারা সূর্যের নীল আলো গ্রহণ করে কমলা,লাল আলো নির্গত করে।